মংলার কাছে ফণীঃ তলিয়ে যাচ্ছে গ্রাম, ঘরবাড়ি ছাড়ছে মানুষ!

ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’র প্রভাবে বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয় প্লাবিত হয়েছে। অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে গুরুত্বপূর্ণ মালামাল নিয়ে আশ্রয় নিতে শুরু করেছেন পার্শ্ববর্তী নিরাপদ স্থানে।

শুক্রবার (০৩ মে) সকাল থেকে বলেশ্বর নদীর পানি বাড়তে থাকে। স্রোতের চাপে উপজেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ৩৫/১ ফোল্ডারের বেড়িবাঁধ ভেঙে বগী, সাতঘর এলাকার লোকালয়ে পানি ঢুকে ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে।

অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে সন্তান-সন্ততি ও মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে পার্শ্ববর্তী এলাকায় অবস্থান নিয়েছেন। পরিস্থিতির অবনতি হলে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ারও প্রস্তুতি রয়েছে তাদের।

বগী গ্রামের বাসিন্দা রাজ্জাক তালুকদার বলেন, সিডরে মরেছে আত্মীয়-স্বজন। ফণীর কথা শুনেই আতঙ্কে আছি। আজ সকালে বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকলয়ে পানি ঢুকেছে। খুব বিপদে আছি।

আতঙ্কের কথা জানিয়ে আবুল হাশেম নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান করছি। বেড়িবাঁধ ভেঙে আমার বাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। কি হবে জানি না। সন্তানদের আত্মীয় বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি।

এদিকে জনগণের তুলনায় অপ্রতুল আশ্রয় কেন্দ্রের কথা উল্লেখ করে জহির উদ্দিন বলেন, ফণী আঘাত হানলে আমরা কিভাবে বাঁচবো। আশ্রয়কেন্দ্রে এত লোক থাকবে কীভাবে?

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য রিয়াদুল হোসেন পঞ্চায়েত বলেন, বেরিবাঁধটি আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ। সকালে জোয়ারের পানির চাপে ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়েছে। বেশকিছু ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে।

বেড়িবাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে গ্রাম। ছবি: বাংলানিউজ‘পানির চাপ বাড়লে আরও কয়েকটি এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে বেড়িবাঁধের আশপাশের মানুষগুলো ঘর ছেড়ে অন্যত্র অবস্থান নিতে শুরু করেছেন।’

তিনি বলেন, আমরা এর আগেও দাবি জানিয়েছিলাম মজবুত করে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করার। কিন্তু তা করা হয়নি। কর্তৃপক্ষের খামখেয়ালিতে আমরা এখন অসহায় হয়ে পড়েছি।

সাউথখালী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান বলেন, বগী এলাকার বেড়িবাঁধের একটি অংশ ভেঙে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। লোকালয়ে পানি ঢুকছে।

তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, আশ্রয়কেন্দ্র ও স্বেচ্ছাসেবকরা প্রস্তুত রয়েছেন বলে জানান তিনি।

এদিকে ঘূর্ণিঝড় ফণী আতঙ্কে মোংলা, রামপাল ও কচুয়ার মাছ চাষিরা ঘেরের পাশে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। আতঙ্কে ঝড়ের তোরে ঘেরের পাড় ভেঙে মাছ ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

এচাড়াওঃ ভারতেও ওড়িশায় আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় ফণী বাংলাদেশের মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৫৪৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরগুলোর মধ্যে বর্তমানে ফণী মোংলা বন্দর থেকে সবচেয়ে কম দূরত্বে অবস্থান করছে।এটি আজ (শুক্রবার) মধ্যরাতে বাংলাদেশের খুলনা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হানবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতর।শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অধিদফতরের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান অধিদফতরের উপ-পরিচালক আয়েশা খাতুন।

তিনি বলেন, ‘এই অতি প্রবল ঘুর্ণিঝড় ফণী, উত্তর-উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে, আজকে সকাল ৯টায় ভারতের পুরীর কাছ দিয়ে ওড়িশা উপকূল অতিক্রম শুরু করেছে। এই উপকূলটা অতিক্রম আজকে বিকাল নাগাদ সম্পন্ন হতে পারে। আজকে সকাল ৯টায় ফণীর যে অবস্থান, সেখান থেকে আমাদের যে সমুদ্র বন্দরগুলো আছে, সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম দূরুত্ব মোংলার। মোংলা থেকে ৫৪৫ কিলোমিটার দূরে আছে ঘূর্ণিঝড়টি।’

ঘূর্ণিঝড়টি উপকূল অতিক্রম করার পর এটা আবারও উত্তর-উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হবে বলেও জানান আয়েশা খাতুন। তার বক্তব্য, ‘এটা ভারতের ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গ অতিক্রম করে আজ মাঝরাত নাগাদ বাংলাদেশে পৌঁছাতে পারে। দেশের অনেক স্থানে মেঘলা আকাশ আছে এবং ঢাকাতেও বৃষ্টিপাত ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবেই হয়েছে।

আয়েশা খাতুন বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৭৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ হচ্ছে ১৮০ কিলোমিটার। যা দমকা বা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে উল্লেখ করে এই উপ-পরিচালক আরও বলেন, ‘উপকূলীয় জেলা ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং তাদের যে অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরাঞ্চল আছে, সেগুলোও কিন্তু এই ৭ নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে।’

‘আর চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বলেছি। সেই সাথে উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী ও চাঁদপুর এবং তাদের যে অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরাঞ্চল এই ৬ নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে। কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে আমরা ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত দেখিয়ে যেতে বলেছি।ঘূর্ণিঝড় ও অমাবস্যার প্রভাবে উপকূলীয় জেলা যেমন: চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, বরগুনা, ভোলা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৪ থেকে ৫ ফুট উঁচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে বলেও জানাআয়েশা খাতুন।

Please follow and like us: